জার্মান পড়ালেখা, কালচার ও কিছু এলোমেলো কথা
অন্যান্য দেশের মতো এই দেশে মাষ্টার্সের ছাত্রদের দিয়ে এরা শুরুতেই রিসার্চল্যাবে বসিয়ে দেয় না। এরা মূলত পিএইডি ছাত্রদের দিয়েই রিসার্চ করায়। তবে বিভিন্ন রিসার্চ ইন্সিটিউটে পার্ট টাইম রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করা যায় এখানে। তবে সেটি মাষ্টার্স কোর্সের অন্তভুর্ক্ত নয়। মাষ্টার্স কোর্সে এরা এক গাদা থিওরি পড়ায়। আমাদের দেশের ব্যাচেলর কোর্সের মতন। রিসার্চ নিয়ে এরা আসলেই খুব চুজি, তাই শুধু পিএইচডি দের দিয়েই ওরা রিসার্চ করায়। প্রথম দুই সেমিষ্টারে আমি ৬০ ক্রেডিট কোর্সওয়ার্ক করলাম। ১২ টা কোর্স। এই সেমিষ্টারেও ৩টা কোর্স এবং একটা গ্রুপ প্রোজেক্ট করতে হচ্ছে। সাথে আছে সেমিনার প্রেজেন্টেশান। পরের সেমিষ্টার শুধু থিসিসের কাজ। এত চাপ সামলাতে গিয়ে ফ্রাস্টেটেড হয়ে যাওয়াটা এইদেশে একটি কমন বেপার। তাই যখন কোর্সের শুরুতে ফেসবুকে আমার কোর্সের একটি ফেবুগ্রুপে কোর্সকোওর্ডিনেটরের সাথে গ্রুপ চ্যাট করছিলাম, তিনি বলেছিলেন এভারেজ ২.৫+ বছর লাগে এই দেশে মাষ্টার্স পাশ করতে। কেন লাগে সেটা এখন বুঝতে পারতেছি হাড়ে হাড়ে।
এই দেশের প্রফেসরদের পড়ানোর দক্ষতা চোখে পড়ার মত। রিয়েল ফিল্ড রিসার্চের সাথে যুক্ত আছে বলেই হয়ত এদেরকে প্রশ্ন করে প্রায় আটকানোই যায় না। বরং কি যে ছাতামাথা পড়ায় সবই মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। রোবোটিক্স থিওরি পড়াচ্ছে ড. হফমান। রোবট বিহেভিয়ার নিয়ে। দুনিয়ার সব ম্যাথেমেটিক্স, প্রোব্যাবিলিটির থিওরি দিয়ে জগাখিচুরি মার্কা গ্রাফের পর গ্রাফ বুঝাচ্ছে। সেই কি ভয়ঙ্কর গ্রাফ! ভাগ্যিস আমি কিছু বুঝিনা, এই গ্রাফগুলো দেখেই দুর্বল হৃদয়ের যে কারোর হার্ট এটাক হবে, না জানি বুঝার পর তার কি হবে! ম্যাটলেবে প্রোগ্রামিং করতে হচ্ছে রোবট বিহেভিয়ার নিয়ে। আর সিমুলেশান করতে হচ্ছে কিছু সিমুলেটর দিয়ে। সেই বায়াস ল, কন্ডিশনাল প্রোব্যবিলিটি, লাইকলিহুড এস্টিমেশান আর হাবিজাবি কি কত কিছু মিলায়ে সবকিছু কঠিন থেকে কঠিনতর করে তারপরেই তারা একটা প্রশ্ন সাবমিট করে আমাদের কাছে, আমাদের মাথা ঘুড়ায়ে দেওয়ার জন্য!
বাংলাদেশের প্রফেসরদের সাথে এদের পার্থক্যও আছে বেশ। কেউ ক্লাসে কিছু না বুঝলে ইচ্ছামতো ঘুমাতে পারে (আমার মত!), ভাল না লাগলে বের হয়ে যেতে পারে। কে ত্যাড়া হয়ে বসল, কে পায়ের উপর পা তুলে বসল, কে জানালার দিকে তাকায়ে উদাস হয়ে অন্যচিন্তা (!) করল, আর কে ক্লাসে বসে অন্য কাজ করতে লাগল বা আর কারই বা মোবাইলে ‘কাহো না প্যায়ার হ্যায়’ বেজে উঠল – এইগুলো নিয়ে প্রফেসরদের মাথাব্যাথাই নাই একদম! প্রফেসররা খুবই প্রফেশনাল, নিজের দায়িত্বটুকুই ১০০% পালনে কমিটেড। শুধু পড়ানোতেই নিজেকে শতভাগ ঢেলে দেওয়ার দিকেই তাদের মনোযোগ। যারা ইন্টারেষ্টেড ইনাফ তারা মনোযোগ দিবে, যাদের কোন ইন্টারেষ্ট নাই তারা চলে যাবে। এই নিয়ে প্রফেসরদেরকে কোনদিন হাহুতাশ করতে দেখিনি, বিরক্ত হতেও দেখিনি। ক্লাসে ছাত্রদের গোসিপিং দেখেও এক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায় না এরা বা কেউ ক্লাসে আসল বা গেল সেদিকে তাকায়ও না!
এরা একদম পাঙচুয়াল। এবং শুধু পড়ায়ে দিয়েই তারা তাদের কাজ শেষ বলে মনে করে না। তাদের প্রতিটি কোর্সের জন্য সাপোর্টিং কোর্সষ্টাফ থাকে। প্রফেসর শুধু ক্লাস নিবে, থিওরি বুঝাবে। টিউটোরিয়াল ক্লাস (থিওরির এপ্লিকেশান) করায় টিউটররা, যারা মূলত প্রফেসরের পিএইডি স্টুডেন্ট এবং অন্যান্য জুনিয়র টিচার। এবং পুরো কোর্স চলাকালীন সময়ে যেকোন সময় (অবশ্যই এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে) তাদের সাথে বসে কোর্সের যেকোন বিষয় নিয়ে ডিসকাস করা যায়।
রোবোটিক্স নিয়ে পড়ছি বিধায় আমাদের নির্দিষ্ট কোন ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং নাই। কখনও ফিজিক্স বিল্ডিং, কখনও মেকানিক্যাল বা কখনও ম্যাথ, কেমিক্যাল, সিএসিই বা নাম না জানা কত কত যায়গায় ক্লাস করলাম। পুরা ক্যাম্পাসের (আমাদের দুটো ক্যাম্পাস, নর্থ ও সাউথ) প্রায় সব জায়গাই ঘুরা হয়ে গিয়েছে ক্লাস করার সুবাদে। নর্থ থেকে সাউথে যেতে হয় স্কাইট্রেনে (জার্মানীতে ‘হা-বান’ বলে, অনেকটা রোপওয়ে’র মতো)। দুই ক্যাম্পাসের মাঝখানে ১.১কিমি ব্যবধানের গভীর বন। সেই কি গভীর বন! দেখলেই ভয় লাগে! প্রতিদিন যখন হা-বানে করে যাই তখন ভাবি এইখানে ১০টা ইলিয়াস আলীকে গুম করলেওতো খুজে পাওয়া সম্ভব হবে না! প্রাকৃতিক এই গহীন বনের উপর দিয়ে স্কাইট্রেনের আইডিয়াটা চরম লেগেছে! ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝে অবশ্য ম্যানমেইড ছোটখাট টিলাও দেখা যায়। ক্যাম্পাসকে সুন্দর করার জন্য এরা কত রকম আয়োজন করেছে!
ক্যাম্পাসের মাস্টার রোলের কর্মচারীরা সর্বদা ক্যাম্পাসকে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার রাখে। চারিদিক বেশ ভালই পরিষ্কার। বিল্ডিংগুলো কাচেঁ ঘেড়া, এবং বিভিন্ন শিল্পমন্ডিতভাবে বানানো। দেখলেই মন জুড়ে যায়। আরও আজব বিষয় হল এরা ক্যাম্পাসের যেখাসে সেখানে আকাঁআকিঁ করে না আমাদের দেশের মত! এত সুন্দর সাদা দেওয়াল থাকলে কবেই আমরা অমুক+তমুক লিখতাম, বা অমুক দলে যোগ দিন, তমুক লীগে শরিক হন লিখতাম! আর এত সুন্দর কাচেঁ ঘেড়া ক্লাসরুম পেলেতো ‘ভাঙগাড়ি’ বলে গাড়ির কাঁচ ভাঙ্গার মতো এগুলোও ভেঙ্গে সরকারকে রাস্তায় বসায়ে দিতাম ছাত্র আন্দোলনের নামে!
এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্লাসে ক্লাস করলাম, কিন্তু চেয়ার টেবিল দেওয়ালে কলমের আকাঁবুকি কোথাও দেখিনি! সবই অলমোষ্ট পরিষ্কার! বড়ই আজব এই দেশী ছাত্র-ছাত্রীরা! আমার মনে আছে কলেজে থাকতে স্যারের বাসার টেবিলে আমাদের মত জ্ঞানীগুনী ছাত্ররা এমনই কারুকার্য সমন্বিত শিল্পীসত্ত্বার পরিচয় দিয়েছিল (অমুক মেয়ে পেত্নীমুখী, অমুন ছেলে মদনকুমার…ইত্যাদি) যে সেই টেবিলকে প্লানার মেশিন দিয়ে প্লেইন করে সব তুলতে হয়েছিল!
ল্যাবগুলো বেশ চমৎকার। এই দেশের ল্যাবওয়ার্কগুলোতে আসলেই মস্তিষ্কের পূর্ণ ব্যবহার করা প্রয়োজন হয়। কোন রিপোর্ট লেখার প্রয়োজন হয়নি আমাদের। প্রতিটি ল্যাব এক্সপেরিমেন্টের জন্য ৩০/৩৫ পেজের ডেমোনস্ট্রশান বুক থাকে। সেখানে প্রয়োজনীয় সকল থিওরি থেকে শুরু করে সকল ডিটেইলস দেওয়া থাকে। এবং আমাদেরকে শুধু সেই থিওরিগুলোকে প্র্যাকটিক্যালি ইম্প্লিমেন্ট করতে হয় সম্পূর্ণভাবে নিজের বুদ্ধি দিয়ে। চরম ব্রেইন স্টর্মিঙের কাজ। এরা আমাদের দেশের মত ৪ বছরে ২০০ সেশনাল রিপোর্ট লিখিয়ে দিস্তা দিস্তা কাগজ, কালি আর গায়ের শক্তি অযথা খরচ করাতে ইচ্ছুক না। গায়ের শক্তির অপব্যায়ের বদলে এরা মাথা খাটানোর অভ্যাস তৈরী করাতেই বেশী উন্মুখ। প্রতিটি এক্সপেরিমেন্টের আগে ও পড়ে লম্বা সময় ধরে ওরাল পরীক্ষা হয়। সেই ওরাল থেকেই খুটিঁয়ে খুটিঁয়ে ওরা বের করে আসলে আমরা কি শিখলাম, কোন আইডিয়া দিয়ে প্রবলেম সলভ কররাম। তা দেখেই ওরা গ্রেডিং করে।
এই দেশের সবচেয়ে ভয়াভহ স্থান হচ্ছে এদের লাইব্রেরী। এদের পড়ালেখা যা করার সবই এরা এই লাইব্রেরীতে বসেই করে। বাসায় এরা পড়ালেখা করেনা। তাই লাইব্রেরী সবসময়ই হাউজফুল থাকে। এদের পড়ার অবস্থা দেখে মনে হয় এরা শুধু পড়ালেখা করার জন্যই জন্মাইছে। ঘন্টার পর ঘন্টা এদের মনোযাগী পড়া দেখে ভাবি এরা জানোয়ার না মানুষ!! এটম বোমা মারলেও মনে হয় এরা পড়া বন্ধ করবে না!! এদের এইরকম ভয়াভয় পড়ার মুড দেখে মনে হয় এমন পরিবেশ যদি থাকত আমাদের ইউনিভার্সিটিগুলোর লাইব্রেরীতে!
জার্মানরা বেশ খাদ্যরসিক। ফুড এবং ড্রিংসের সমাহার এই দেশে। কালচার্যামলী এরা বেশ রিচ’ও। আজ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লসের টিচারের সাথে ক্রিসমাস মার্কেটে এক্সকারসনে গেলাম। উনি দেখালেন দোকানের প্রতিটি জিনিষ। বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট কিছু কালচার রয়েছে, এবং ওই শহর থেকে আসা দোকানগুলো তাদের সেই কালচারকে প্রকাশ করছে। কেও স্ট্যাচু, কেও চকোলেট বা কেও কেক, কুকিজ, পিঠা ইত্যাদি এনেছে। কাঠের সামগ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের খাবারের হিস্টোরীসহ অনেক কিছুরই হিস্টোরী বললেন আমাদের টিচার। সবকিছুর এত কালচার্যা ল ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে আমি ভাবলাম আমাদের দেশে এত কালচার কই? আমার সাথের কোলকাতার এক বাঙ্গালীকে জিজ্ঞাসা করলাম বাঙ্গালীদের কি কালচার আছে বলোতো? সে বলল, মাছে ভাতে বাঙ্গালী ছাড়াতো আর কিছুই তেমন মনে নেই! অথচ এদেশীরা ওয়াইন এর কালচার (খারাপ হইলেও, কালচার তো!) কত সুন্দর করে ধরে রেখেছে!! ‘গ্লুহ্ভাইন’ নামে একটি ওয়াইনের দোকানে দেখলাম প্রচন্ড ভিড়। এই ওয়াইন এর যে ডেসক্রিপশান দিলেন আমাদের টিচার তাতে বুঝলাম এটি আমাদের দেশের ‘বাংলা মদ’ এর সমকক্ষ! তবে এতে নাকি কিছু স্পাইস এবং ফ্রুটস মিশানো হয়। খুব ঠান্ডার মধ্যে এরা এগুলো গলাধ:করণ করে ইচ্ছামতো! এরা ঠান্ডায় ড্রাঙ্ক হয়ে থাকতে নাকি খুব পছন্দ করে!
অতি মাত্রায় সোশিয়াল এরা। আমাদের দেশের মত বন্ধের দিনে বাসায় বসে লেপের নীচে অলস সময় কাটিয়ে দেবার মত মানুষ না এরা। কোথাও ঘুরতে যাবে, পার্টিতে যাবে বা প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলবে। তাদের কোন কাজে সাহায্যও করতে প্রস্তুত। নিজে কোন ডিসিশান নিতে না পারলে প্রতিবেশী, বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলবে। প্রণয়ের ক্ষেত্রেও এরা খুব সৎ। যারা প্রেমিক-প্রেমিকা তারা নিজেদেরকে যথেষ্ট সময় দেয়, একসাথে ঘুরে, সামনা-সামনি কথা বলে, খায়। এবং এরা সম্পর্ককে খুব সম্মান করে। নিজের প্রেমিক/প্রেমিকা ছাড়া অন্যদের নিয়ে চিন্তা করে না! (বেশ কয়েকজনের থেকে এই তথ্য পেয়েছি আমি, এবং নিজের দেখা এটি উদাহরণও আছে) আমাদের দেশের মতো সারারাত না ঘুমায়ে মোবাইল কোম্পানীর ১২০% লভ্যাংশ বাড়ায় না! বা, তিন প্রেমিক দুই প্রেমিকাও বানায় না! (তবে প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে ছাড়াছাড়ি হলে অতিসত্ত্বর অন্যদের দিকে নজর দেয়!!)
ট্রেন ষ্টেশানে দাড়িয়ে আছি ট্রেন ধরব বলে। একটি ট্রেন দাড়িয়ে আছে, পরের ট্রেনটিতে আমি উঠব। দুটো ১০/১২ বছরের ভাইবোন তার বাবার সাথে প্লাটফরমে দাড়িয়ে আছে। আর প্রচন্ড ভাবে হাত নাড়িয়ে বাই বাই জানাচ্ছে ট্রেনে বসা তাদের মাকে। আবেগের চোটে লাফাচ্ছে। ফ্লাইই কিস দিচ্ছে। তাদের বাবা অবাক দৃষ্টিতে পরম তৃপ্তিতে তাকিয়ে আছে ছেলেমেয়ে দুটোর দিকে। ট্রেনটি চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা হাত নাড়িয়েই চলল! এই দেশে এসে এমন দৃশ্য দেখব তা কখনও ভাবিনি! এই দেশের ভঙ্গুর পারিবারিক জীবন নিয়ে অনেকের মত আমারো ঋণাত্বক ধারণা ছিল। এখনও আছে। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য আসলেই নিজেকে বাকরুদ্ধ করে দেয়।
দ্রষ্টব্য এটি শুধুমাত্র প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য যারা সত্যিই বিদেশ থেকে বিদেশে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। আবেদনকারীরা দৃঢ়ভাবে আমাদের অফিসে :
সরাসরি যোগাযোগ বা মৌলিক তথ্যের জন্য ফোন 01911878274 এ সরাসরি যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়। যদি আপনি আরও যেতে চান তবে পাসপোর্ট সহ আপনার সমস্ত অ্যাকাডেমিক নথির সাথে আমাদের অফিসে যান।
সানরাইজ এডুকেশন কন্সালটেন্টস
ফোন: 01911878২74; 01707272625
ইমেইল: info@sunrise-bd.net
ওয়েবসাইট: www.sunrise-bd.net
Saturday, November 10, 2018
জার্মান পড়ালেখা, কালচার ও কিছু এলোমেলো কথা
Tags
About Sunrise Education Consultants
Sora Blogging Tips is a blogger resources site is a provider of high quality blogger template with premium looking layout and robust design. The main mission of sora blogging tips is to provide the best quality blogger templates.
Subscribe to:
Post Comments (Atom)

No comments:
Post a Comment